দৈর্ঘ্য-প্রস্ত, সমুদ্র, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, প্রান্তরাদি, পৃথিবীর শহর-বন্দর, বিজনভূমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকাসমূহ, পারিভাষিক অর্থে সাত মহাদেশ। সুবিধিত দেশসমূহ এবং বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক উদ্ভিদজাত, খনিজ ও বাণিজ্যিক বিষয়াদি সম্পর্কে আলোকপাতকারী তাফসীরবিদগণ বলেন, গোটা পৃথিবীর একভাগ স্থল এবং তিনভাগ পানি। এ ভূ-ভাগের পরিমাপ হচ্ছে নব্বই ডিগ্রী। আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করেই এ বিশাল পানি রাশিকে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত রেখেছেন যাতে করে প্রাণীকুল জীবন যাপন করতে পারে এবং শস্যাদি এবং ফলমূল উৎপন্ন হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন -‘তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্ট জীবের জন্য, এতে আছে ফলমূল এবং খেজুর গাছ, যার ফল আবরণযুক্ত এবং খোসাবিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। অতএব, তোমরা (জ্বিন ও মানবজাতি) উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে। [সূরা আর-রহমান : ১০-১৩]
তাঁরা বলেন, পৃথিবীর স্থল ভাগের তিন ভাগের দু’ভাগ বা তদপেক্ষা একটু বেশিতে মানুষের বসবাস রয়েছে। এর পরিমাপ ৯৫ ডিগ্রী। তারা আরো বলেন, সমুদ্রসমূহের মধ্যে একটি হলো, পশ্চিম মহাসাগর যাকে আটলান্টিক মহাসাগরও বলা হয়। এ মহাসগরই পশ্চিমের দেশগুলোকে ঘিরে আছে। এর পশ্চিম ভাগে আছে ছ’টি দ্বীপ। এ মহাসগার ও এর উপকূলের মাঝে প্রায় এক মাসের পথে দশটি ডিগ্রী রয়েছে। এটি এমন এক সাগর অধিক ঢেউ এবং আবহাওয়া ও তরঙ্গ সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে এতে চলাচল করা অসম্ভব প্রায়। তাতে কোন শিকারও নেই এবং তা থেকে কোন কিছু আহরণও করা হয় না এবং বাণিজ্য বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে তাতে ভ্রমণও করা যায় না। দক্ষিণ দিক ঘেঁষে এটি কামার পর্বতমালার দিকে চলে গেছে। এ কামার পর্বতমালাই মিসরের নীল নদের উৎসস্থল। তারপর বিষুবরেখা অতিক্রম করে তা চলে গেছে পূর্ব দেিক। তারপর আরও পূর্ব দিকে মহাসাগরটি অগ্রসর হয়ে তাই পৃথিবীর সর্বদক্ষিণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে কয়েকটি দ্বীপ রয়েছে যা আয্যাবিক দ্বীপপুঞ্জ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এ মহাসগারটি ভারত মহাসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তারপর পূর্ব-উত্তর দিকে গিয়ে পৃথিবীর পুর্ব দিকের শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে। সেখানেই চীন সাগরের অবস্থান। তারপর চীনের পূর্বে মোড় নিয়ে তা উত্তর দিকে চলে গিয়ে চীন দেশ অতিক্রম করে চলে গেছে য়াজূজ-মাজূজের প্রাচীর পর্যন্ত। সেখান থেকে আবার এমন একদিকে মোড় নিয়েছে যার অবস্থা কারো জানা নেই। তারপর পৃথিবীর উত্তর-প্রান্তে পশ্চিম দিকে রাশিয়া পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে এবং তা অতিক্রম করে আবার পশ্চিম-দক্ষিণে মোড় নিয়ে পৃথিবী ঘুরে এসে পুনরায় সোজা পশ্চিম দিকে গিয়ে পশ্চিম থেকে প্রণালী (জিব্রালটার প্রণালী) অঞ্চলের দিকে চলে যায়, যার শেষ প্রান্ত সিরিয়ার দিকে গিয়ে ঠেকেছে। তারপর রোমের পথ ধরে তা কনস্টান্টিনোপল প্রভৃতি অঞ্চলে গিয়ে মিলিত হয়েছে।
পূর্ব মহাসাগর থেকে আরো কয়েকটি সমুদ্র প্রবাহিত হয়েছে। সেগুলোতে অনকে দ্বীপ আছে। এমনকি কথিত আছে যে, কেবল ভারত সাগরেই জনশূন্য দ্বীপসমূহের কথা বাদ দিলেও শহর-বন্দর ও অট্টালিকাদি বিশিষ্ট দ্বীপের সংখ্যা এক হাজার সাতশ। এই সাগরসমূহকে বাহরে আখসারও বলা হয়ে থাকে। এর পূর্বাংশে চীন সাগর, পশ্চিমে ইয়ামান সাগর, উত্তরে ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণে কী আছে তা অজ্ঞাত।
বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ভারত মহাসাগর ও চীন সাগরের মধ্যখানে দু’য়ের মাঝে ব্যবধান সৃষ্টিকারী কয়েকটি পাহাড় আছে এবং স্থলপথের ন্যায় কয়েকটি প্রশস্ত পথ-ও আছে যা দিয়ে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন – ‘এবং আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত যাতে পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঢলে না যায় এবং আমি তাতে করছি প্রশস্ত পথ যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছুতে পারে। [সূরা আম্বিয়া : ৩১]
ভারত উপমহাদেশের বাতলীমূস নামক জনৈক রাজা তাঁর ‘মিজেসতী’ নামক গ্রন্থে খলীফা মামুনের আমলে যা আরবীতে অনূদিত হয়েছিল, যা এ সংক্রান্ত বিদ্যার উৎস বলে পরিগণিত,  তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পশ্চিম, পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর মহাসাগর থেকে প্রবাহমান সমুদ্রের সংখ্যা অনেক। এগুলোর মধ্যে এমনও রয়েছে যা আসলে একই সাগর, তবে পার্শ্ববর্তী জনপদের নামানুসারে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো, বাহরে কুলযূম বা লোহিত সাগর। কুলযূম হচ্ছে আয়লার কাছাকাছি সমুদ্রের উপকূলবর্তী একটি গ্রাম। আরো আছে পারস্য সাগর, কাস্পিয়ান সাগর, অরনক সাগর, রোম সাগর, বানতাশ সাগর ও আযরাক সাগর। আযরাক উপকূলবর্তী একটি শহরের নাম। একে কারম সাগরও বলা হয়। এটি সংকীর্ণ হয়ে দক্ষিণ কনস্টান্টিনোপলের নিকট ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে। এটি কনস্টান্টিনিপলের উপসাগর। আর এ কারণেই কারম সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে আসার সময় নৌযানসমূহ দ্রুত চলে কিন্তু পানির বিপরীতে প্রবাহের কারণে আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কারমে আসার সময় চলে ধীরে গাতিতে। আর এটি পৃথিবীর একটি অত্যশ্চার্য ব্যাপার। কারণ যত প্রবাহমান পানি আছে সবই মিষ্ট, কিন্তু এটি তার ব্যতিক্রম আর সকল স্থির সমুদ্রের পানি লোনা, খর। কিন্তু কাস্পিয়ান সাগর তার ব্যতিক্রম। একে জুরজান সাগর ও তাবারিস্তান সাগরও বলা হয়। পর্যটকদের বর্ণনা, এর বিরাট এক অংশে পানি সুমিষ্ট ও সুপেয়। জ্যোতির্বিদগণ বলেন, এ সাগরটি প্রায় গোলাকার। কেউ কেউ বলেন, তান নৌকার পালের ন্যায় ত্রিকোণা বিশিষ্ট। মহাসাগরের কোন অংশের সঙ্গে তার সংযোগ নেই বরং তা সম্পূর্ণ আলাদা। তার দৈর্ঘ্য আটশ’ মাইল ও প্রস্থ ছয়শ’ মাইল। কেউ কেউ এর বেশিও বলেছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
ঐ সমুদ্রগুলোর  আরেকটি হলো বসরার নিকটবর্তী সাগর, যাতে জোয়ার-ভাটা হয়। সাগরের এলাকার দেশগুলোতেও এর অনুরূপ সাগর রয়েছে। চন্দ্র মাসের শুরু থেকে পানি বাড়তে শুরু করে এবং পূর্ণিমা রাতের শেষ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এ হলো জোয়ার। তারপর কমতে শুরু করে মাসের  শেষ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এ হলো ভাটা। বিশেষজ্ঞগণ এসব সাগরের সীমারেখা এবং এগুলোর উৎস ও মোহনাসমূহের উল্লেখ করেছেন এবং পৃথিবীর ছোট ছোট নদ-নদী এবং খাল-নালার আলোচনাও তাঁরা করেছেন। আবার বড় বড় প্রসিদ্ধ নদ-নদী এবং সেগুলোর উৎস ও মোহনাসমূহের কথাও তাঁরা উল্লেখ করেছেন। আমরা এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব না আমরা কেবলমাত্র হাদীসে বর্ণিত নদীসমূহ সম্পর্কেই আলোকপাত করব।
আল্লাহ তা’লা বলেন-‘তিনিই আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে, যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মুল উৎপাদন করেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তাঁর বিধানে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূকে।
তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী এবং তোমাদের কল্যানে নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে। এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তোমরা  তার নিকট যা চেয়েছ তা থেকে। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই অতিমাত্রায় জালিম, অকৃতজ্ঞ। [সূরা ইবরাহিম : ৩২-৩৪]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে কাতাদা রহ. সূত্রে আনাস ইবনে মালিক ও মালিক ইবনে সা’সা’আ থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনাকালে বলেছিলেন: ‘আমি দেখতে পেলাম যে, তার মূলদেশ থেকে দু’টো অদৃশ্য নদী ও দু’টো দৃশ্যমান নদী বেরিয়ে যাচ্ছে। অদৃশ্য দু’টো জান্নাতে আর দৃশ্যমান দু’টো হলো নীল ও ফোরাত।’ [বুখারী ও মুসলিম]
অন্য এক হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন- ‘আমু দরিয়া ও শির দরিয়া ফোরাত ও নীল সব ক’টিই জান্নাতের নদী।’ [সহীহ মুসলিম]
এক হাদিসে এসেছে, হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- ‘জান্নাত থেকে চারটি নদী প্রবাহিত করা হয়েছে। ফোরাত, নীল, আমু দরিয়া ও শির দরিয়া।’ [মুসলিম]
সম্ভবত এর দ্বারা পরিচ্ছন্নতা, স্বাদ ও প্রবাহের ক্ষেত্রে এ নদীগুলো জান্নাতের নদ-নদীর সাথে সাদৃশ্য রাখে বলে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। এ ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা আবূ হুরায়রা রা. সূত্রে ইমাম তিরমিযী রহ. বর্ণিত ও তাঁর দ্বারা সহীহ বলে আখ্যায়িত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. -এর সেই হাদিসে রয়েছে যাতে তিনি বলেছেন, ‘আজওয়া (উন্নতমানের এক প্রকার খেজুর) জান্নাতী খেজুর এবং তাতে বিষ-এর উপশম রয়েছে।’ [তিরমিযী] অর্থাৎ আজওয়া জান্নাতের ফল-ফলাদির সাথে সাদৃশ্য রাখে। এর অর্থ এ নয় যে, এটি জান্নাত থেকে আহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে। কেননা, বাস্তবে এর বিপরীতটিই পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং এটা যে শাব্দিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, তা স্পষ্ট। অনুরূপ অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন : ‘জ্বর হল জাহান্নামের তাপ। কাজেই তাকে তোমরা পানি দ্বারা ঠান্ডা কর। [ইবনে মাজাহ] আরেক হাদিসে আছে, ‘জ্বর তীব্র আকার ধারণ করলে তাকে তোমরা পানি দ্বারা ঠাণ্ডা করে নিও। কেননা গরমের তীব্রতা জাহান্নামের তাপ বিশেষ। [বুখারী] তদ্রুপ এসব নদ-নদীর উৎসও পৃথিবীতেই।
চলবে.

 

তথ্য সুত্রঃ আল জান্নাত || মাসিক ইসলামিক ম্যাগাজিন

ইসলামের দৃষ্টিতে জগতের সৃষ্টির সূচনা ও কিছু আলোচনা…

One thought on “ইসলামের দৃষ্টিতে জগতের সৃষ্টির সূচনা ও কিছু আলোচনা…

  • Profile photo of Maanush
    December 28, 2012 at 3:39 pm
    Permalink

    “এ ভূ-ভাগের পরিমাপ হচ্ছে নব্বই ডিগ্রী।” – Ektu bujhiye bolun-na.
    “আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করেই এ বিশাল পানি রাশিকে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত রেখেছেন…….” – Eta Allah rakhen-ni. Gravitational force rakh-chhe.

Leave a Reply