বেলী আক্তার, বয়স ১৫, বসবাস: পিটিআই কলোনী, খুলসী, চট্টগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তীতে আরো অনেক আটকে পড়া পাকিস্হানীদের মতো তার পরিবারও আটকে পড়ে চট্টগ্রামের খুলশী কলোনীতে বসবাস করে আসছিলো। পাচঁ ভাইবোনের মধ্যে সে সবার ছোট। বাকী চার বোন পড়ালেখা করে না পাশে সেলাই ও কারচুপি বা হাতের কাজ শিখে ও দুটো টাকা মজুরী স্বরুপ পায়। অন্যদিকে বেকার ভাই কিছুই করেনা।

বেলী অনেক ঝুট ঝামেলা মাথায় নিয়ে শেষে নিকটতম’ মহিলা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার নামক একটি স্কুলে ভর্তি হয় এবং এ বছর চলমান এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিবে এমনই তার ইচ্ছা ছিল। তার সাথে তার আরো আরো বান্ধবীরা যারা একই কলোনীতে থাকে তারা ও এবার পরীক্ষায় বসবে, তার নিজ পরিবারের একজন দায়সাড়া ভাবে বড়ো হচ্ছে, বড় ভাই দিনে কোথায় থাকে তার জানা নেই, ছোট বোনটা ক্লাস টু’তে পড়ে। তার বাবা জুট মিলের একজন শ্রমিক ছিলেন. যা বেতন পান তা দিয়ে তার নিজের নেশার টাকার যোগান হতে চাই না, অন্যদিকে তার মা সেলাইয়ের কাজ কর্ম ও বাসা-বাড়ীতে ঝি চাকরের কাজ করে সংসারটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল কোন রকমে। যে যুগ আসছে, তাতে তাদের মতো বিশাল পরিবারের খরচ সামলাতে তার মাকে ও ভাইবোনদের হিমসিম খেতে হয় প্রতি নিয়ত।

অভাব অনটনের নিত্য টানাটানিতে ছয় ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করানো দূরে থাক কত দিক থেকে বড় বোনের ঘর আসে বিয়ের কিন্তু যারা আসে তারা যে লোক ভাল নয় তা বেলীর বাবা বুঝে, তবুও অভাবের কাছে নত হয়ে একদিন মেঝ’টাকে তারা তুলে নিয়ে যাই, এতে তার হাতে কিছু টাকা আসে, বেলীর মা সেদিন দেরী করে কাজ থেকে ফিরে এইসব শুনে সোজা থানায় চলে যাই আর বেলীর বাবা হিসাব বুঝে টাকাগুলো নিয়ে ছম্পট। কিন্তু‘ সবচেয়ে ছোট বেলী আক্তার বাল্যকাল থেকেই তীর্যক মেধাশক্তির অধিকারী। তাই পুথিগত বিদ্যা না শিখিয়ে মেয়েকে কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বেলীর মা তাকে অষ্টম শ্রেনীর পর পাশের কারিগরী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। শহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাস করলেও অনুন্নত পরিপার্শ্বিকতার কারনে বেলীর স্কুলে আসা যাওয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। তা ছাড়া অষ্টম শ্রেনীতে উঠলেও বেলীর শরীর অন্যান্য স্বাভাবিক মেয়েদের চাইতে একটু ভারিক্কি বটে ফলে বখাটেদের টার্গেট তাকে ঘিরে। বাজে ও উঠতি বয়সের ছেলেদের নানা রকম কু-প্রস্তাব সম্পর্কে সে জানে যাকে বলে ইভ টিজিং যার শিকার হয় তারা প্রতিনিয়ত।

বেলী তার বাবার সহযোগীতায় বখাটেদের অভিভাবকের কাছে নালিশ জানালেও কোন কাজ হয়নি, বরং বখাটেদের উৎপাত আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে বেলীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্তায় লিনাস পরিচালিত জীবনদক্ষতা শিক্ষাও কর্মসূচীর যা বেলীকে সহ তার পাড়ার অনেক মেয়েকে শিক্ষার মাধ্যমে ও সহজ উপায়ে কি ভাবে বখাটেদের ভিতরে মানবিকতা জাগ্রত করে তাদের কে ও সেই শিখায় আলোকিত করা যাই এই সব সে ও তার বান্ধবীরা শিক্ষা লাভ করে, যার তত্ত্বাবধানে থাকে ইপসা ও অর্থায়নে থাকে সেভ দা চিলড্রেন ইউএসএ।

এর পর বেলী আক্তার সিদ্ধান্ত নেয় নিজের সমস্যা তারা নিজেরাই সমাধান করবে । যেভাবেই হোক তাকে স্কুলে যেতে হবে, চালিয়ে যেতে হবে শিক্ষা বন। জীবন দক্ষতা কার্যক্রমের আওতায় এসে সে নিজেকে আবিস্কার করে নতুন শক্তিতে। জীবন দক্ষতার উপাদানের আলোকে পরিবর্তনের ছোঁয়া আনে তার তার কিশোরী জীবনে। চলমান বাধা মোকাবেলা করে সে চলছে সুন্দর আগামীর দিকে।

পিছনের কথা:- 

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে কয়েক হাজার আটকে পড়া পাকিস্তানী পরিবারের মতো বেলীদের পরিবারও নিদারুন দুঃখ কষ্টে দিন অতিবাহিত করেছে। পর্যাপ্ত সামাজিক সুযোগ সুবিধা না থাকার কারনে তাদের নিজেদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অসুস্ত’ সংস্কৃতি। লেখাপড়া না করা, মাদক সেবন, বাল্য বিবাহ এবং অল্প বয়সে গর্ভধারন সহ নানামূখী জটিলতায় ডুবে আছে বিহারী পরিবারগুলো। বিহারী অধ্যুসিত এলাকায় এ জাতীয় সেশন পরিচালনা করাও বেশ কঠিন। লজ্জা ও ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে সবসময়।

এ ধরনের প্রতিকুলতার মধ্য দিয়েও সেখানে লিনাস জীবন দক্ষতা কর্মসূচী বাস্তবায়নের কারনে বেলীর মতো অনেক ছেলেমেয়ের জীবনের গতিপথ বদলে নিতে পেরেছে, তারা আবিস্কার করেছে অজানা এক বিষয়কে। যা তাদের জীবনের জন্য প্রয়োজন। তারা এখন নিজেরাই বুঝতে পারছে নিজের পরিবর্তনগুলো। লজ্জা ও ধর্মের দোহাই দিয়ে এতদিন ডুবে ছিল অন্ধকারে।

পরিশেষে তারা ধন্যবাদ দিতে থাকে সরকারকে, সেভ দ্যা চিলড্রেন ইউএসএ কে, এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নকারী ইপসা ও পরিচালনাকারী লিনাসকে। ধন্যবাদ।

বেলী এখন নিজেই নিজের ছোটখাট সমস্যাগুলো সমাধান করে। সঠিক ভাবে যোগাযোগ করে সে তার বয়সী ও পরিচিত অনেককেই সাহায্যে করছে এ জাতীয় সমস্যা সমাধানে। বেলী স্বপ্ন দেখে নিজ কমিউনিটির প্রত্যেক ঘরে ঘরে জীবন দক্ষতা শিক্ষা কার্যক্রম পৌছে দেয়ার এক সেবামূলক দায়িত্ব নিয়েছেন। কেননা তাদের নিজ গোত্রীয় কতৃক ও নিজেদের সৃষ্ট সমস্যাগুলো থেকে তারা সবাই যেন বেরিয়ে আসতে পারে এখন এটাই তাদের একমাত্র আশা।

(সমাপ্ত)

Leave a Reply