নিমতলী ট্রাজেডি, মিরসরাই ট্রাজেডি, চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার ট্রাজেডি, আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টস ট্রাজেডি, এবং সর্বশেষ সাভার ট্র্যাজেডি। ট্র্যাজেডির পর ট্র্যাজেডি, লাশের পর লাশ। প্রতি ঘটনার পরই রাষ্ট্রীয় শোকপালন এবং তদন্ত কমিটি গঠন হয়। দোষীদের শাস্তি দেওয়ার আশ্বাসের পাশাপাশি সপ্তাহ জুড়ে চলে টকশো। এরপর যথারীতি দর্শক-শ্রোতা হিসেবে আমরা সবকিছু ভুলে গেলেও আমাদের সাথে সাথে ভুক্তভোগীদের কান্নাও কি থেমে যায় কখনো?
২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজায় ভবনধসে শত শত শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আগের দিন মঙ্গলবার রানা প্লাজা নামের ভবনটিতে ফাটল ধরার পর স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভবনটি ঘুরে দেখেন। তাদের সঙ্গে থাকা প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে বুয়েট থেকে প্রকৌশলী এনে ভবনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। নতুবা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। যদিও ভবন মালিক সোহেল রানা এসময় বলেন, সামান্য একটু প্লাস্টার খুলে পড়েছে। এটা তেমন কিছু নয়।
ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার, প্রসাধন সামগ্রী ও কাপড়ের মাকের্ট এবং ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখা ছিল। তৃতীয় তলায় নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ তলায় ফ্যান্টম এ্যাপারেলস লিমিটেড, পঞ্চম তলায় ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেড ও ষষ্ঠ তলায় ঈথার টেক্সটাইল লিমিটেড। এগুলোতে হাজার পাঁচেক শ্রমিক কাজ করতেন। ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিপদের আশংকায় মঙ্গলবারই শাখাটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেন বলে তাদের কোন কর্মকর্তা কর্মচারীর ক্ষতিও হয়নি।
অথচ শিল্প পুলিশের নিষেধসত্বেও পরদিন বুধবার সকালে রানা প্লাজার চারটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় বলে জানা গেছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হলেও তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ কেন নেওয়া হয়নি ? আর ভবনটি আচমকা ধসে পড়েনি বরং ফাটল দেখা দেওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ১৮ ঘন্টা সময় পার হয়েছে। এসময়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ওপর বর্তায়, সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল সে বিষয়টিও এখনো রহস্যজনক। এমনকি ভবনে প্রবেশ বন্ধ করতে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা না করার মতো প্রশাসনিক ঔদাসিন্যের দরুন হাজার হাজার নিহত-আহত হতভাগাদের দায়ভারই বা কার?

রানা প্লাজার বহুতল ভবনধসের মাধ্যমে এ যাবতকালের সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির পর এবার একটি প্রশ্ন খুব জোরেসোরেই উঠেছে যে, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্পটিই বা বারবার কেন দুর্ঘটনায় পড়ছে? আগুন, শ্রমিক-অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, ভবনধসসহ অনিয়মিত ইস্যুগুলো কেনইবা বাংলাদেশের এই শিল্পখাতেই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হচ্ছে?
সরকারি হিসাবে, এখাতে পাঁচবছরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৫১টি। প্রাণ গেছে ৪৮৮ জনের। গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসাবমতে, গত ১৩ বছরে ১৬৬ দুর্ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন পোশাক কারখানায়। এতে নিহত হয়েছেন ২২২ জন শ্রমিক। আর গত ২৩বছরে ভবনধস ও আগুনে প্রাণহানি ঘটেছে ৩৮৮ জন শ্রমিকের। তবে সাভারের এই ভবনধস ছাড়াও গত ২৩বছরে পোশাকশিল্প কারখানায় ২১৭টি দুর্ঘটনা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে, গত পাঁচবছরেই শুধু আগুনে মৃত্যু হয়েছে ৪৫৯ শ্রমিকের। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যকেন্দ্রের হিসেবমতে, গত ১০বছরে গার্মেন্টে মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে একহাজার। বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের জুনমাস পর্যন্ত পোশাকশিল্প কারখানায় ২১৭টি অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ২১২টি ভবনধস হয়েছে। ২৩টি কারখানার ২৭৫ জন শ্রমিক নিহত হন। গতবছর ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টে ১১৩ জনের প্রাণহানিসহ গত ২৩বছরে মোট নিহতদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮৮ জনে।

জানা গেছে, শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো শ্রমিক মারা গেলে সরকার তাকে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। কিন্তু পোশাক শ্রমিকরা মারা গেলে বিজিএমইএ গ্রুপ ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে গতবছর পর্যন্ত একলাখ টাকা প্রদান করেছে। তবে তাজরীন গার্মেন্টস এর ঘটনার পর ওই টাকার পরিমাণ দুইলাখে উন্নীত করেছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
বিধানানুযায়ী বিজিএমইএ’র সদস্যপদ দেয়ার আগে, কারখানা পরিদর্শন করে দেখা হয়, কোনো ধরনের ত্রুটি আছে কিনা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেই কেবলমাত্র সদস্য পদ দেয়া হয়। সেই হিসেবে রানা প্লাজার কারখানায় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ত্রুটিহীন কারখানার সনদ হিসেবে রানা প্লাজা সদস্যপদ পেলো কী করে আর এই ভবনধস বা এতোগুলো মৃত্যুর জন্যই বা কে দায়ী? আসলে লাশের সংখ্যা ও দূর্ঘটনার সংখ্যাগুলো সত্যিই কি কোন অর্থ বহণ করে? বরং প্রকৃত ঘটনা হিসেবে এমন সংখ্যা কেউ কি প্রকাশ করতে পারবে যে, মৃত্যুর বা লাশের এত সংখ্যার জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী নেপথ্যের মানুষ’গুলোর মধ্যে কতজনের শাস্তি হয়েছে? কতজনকে অন্তত ঘটনার পরে ধরা হয়েছে বা ‘খুঁজে’ পাওয়া গিয়েছে? আসল বাস্তবতা এই যে, মালিকরা কখনো কোনো ঘটনার দায় স্বীকার করেন না।

বিশ্বব্যাপী মহামন্দার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের সস্তা শ্রমবাজারের গার্মেন্টখাত অনেকটা সম্ভাবনার দিগন্তরেখা এঁকে দিয়েছিল। কিন্তু সেই গার্মেন্টই এখন মৃত্যু-উপত্যকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, নিরাপত্তাঝুঁকি উপেক্ষা এবং পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে অনেক গার্মেন্ট ভবন। বিকশিত ও লাভজনকখাত হিসেবে রাজধানীর চারপাশে নিচু এলাকা ভরাট করে গড়ে ওঠা শত শত গার্মেন্ট ভবনের অধিকাংশই দুর্বল নির্মাণ অবকাঠামোতে তৈরি। বিপুল অঙ্কের অগ্রিম ও অতিরিক্ত ভাড়ার টাকার আশায় একশ্রেণীর ভবনমালিক পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আর পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে তুলছে গার্মেন্ট কারখানা। ফলে এসব গার্মেন্টের ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, গার্মেন্ট খাতে কর্মরত সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ জন্য তাদের নজরদারিও কম। ফলে কখন কোন এলাকায় নতুন কারখানা হচ্ছে, সেগুলো প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণ করছে কি না তা তদারক করা হচ্ছে না।

এরকম মর্মান্তিক ঘটনায় সম্মান জানিয়ে পতাকা নমিত রাখা বা জাতীয় শোক ঘোষনা করে আসলেই কি কোনো ক্ষতিপূরণ হতে পারে? বরং যদি এমন হতো দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা হতো, ভবিষ্যতে আর কোনদিন এধরনের ঘটনা যেন না ঘটতে পারে তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হতো, তবে হয়তো শ্রমিকদের প্রতি কিছুটা হলেও শ্রদ্ধা আমরা দেখাতে পারতাম! কিন্তু দিনের পর দিন অপরাধী নেপথ্যের ‘মানুষ’গুলো পার পেয়ে যাচ্ছে এবং তাদের শাস্তিই হচ্ছে না। এরফলে জাতি হিসেবে আমাদের মূল্যবোধ, মানবতাবোধ, আইনের শাসন ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্ববাসীর মনে যেমন বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনই আমাদের স্বনামধন্য পোশাকখাতও যে ধ্বংস হচ্ছে, তা যত দ্রুত আমরা উপলদ্ধি করবো ততই মঙ্গল।

অপরাধী নেপথ্য নায়কদের শাস্তি নেইঃ পোশাকখাতে ২৩ বছরে ২১৭ দুর্ঘটনা!

Leave a Reply