৬০ এর দশকে দুনিয়া কাঁপানো এক জনপ্রিয় ব্যন্ড দলের নাম দ্যা বিটলস। সমস্ত ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে তখন ছিল বিটলস উম্মাদনা। সেই সময় শতাব্দীর শো বিজনেসের যাবতীয় রেকর্ড ভঙ্গ করে এই ব্যান্ড দল৷ দলটির সদস্য ছিল চার জন – জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি,  জর্জ হ্যারিসন এবং রিঙ্গো স্টার।

the beatles members
বিটলসের চার সদস্য (বাঁ থেকে) ম্যাককার্টনি, রিঙ্গো স্টার, হ্যারিসন এবং লেনন

১৯৫৭ সালে জন লেনন ইংল্যান্ডের লিভারপুলে একটি ব্যন্ড দল গঠন করেন এবং এর নাম দেন ‘দ্য কোয়ারিম্যান’, এবছরেই জুলায়ে পল ম্যাককার্টনি লেননের সাথে তার যুক্ত হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জর্জ হ্যারিসন দলটির সদস্য হন। ১৯৫৯ সালে লেনন দ্য কোয়ারিম্যানের নাম বদলে রাখেন ‘দ্য বিটলস’।

দ্য বিটলস এর যাত্রা শুরু হয় জার্মানির হামবুর্গ শহরে, ১৯৬০ সালে৷ তখন সদস্য ছিলেন চার তরুণ – লেনন, পল ম্যাককার্টনি,  জর্জ হ্যারিসন এবং ড্রামবাদক পিট বেস্ট৷ হামবুর্গের এই পাবে অতিথিদের চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতি সন্ধ্যায় অন্যান্যদের গানের সাথে তাদের নিজস্ব সংগীত পরিবেশন করতেন ‘দ্য বিটলস’৷

এরপর ১৯৬১ সালে, হামবুর্গে বিটলস’এর প্রথম রেকর্ড ‘মাই বনি’ বের হয়৷ কিন্তু বিটলস নামে নয়৷ সে সময়ের বিখ্যাত ব্রিটিশ রক অ্যান্ড রোল সংগীত শিল্পী টনি শেরিডেন’এর বাদকদল ‘দ্য বিট ব্রাদার্স’ হিসেবে৷ এই গান জার্মান চার্টস বা হিট গানের তালিকায় পাঁচ নম্বরে উঠে আসে৷

ঐ বছরই লন্ডনের সংগীত ব্যবসায়ী ব্রায়ান এপস্টাইন বিটলস’এর  ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পিট বেস্ট’এর জায়গায় যোগ দেন ড্রামবাদক রিংগো স্টার৷ সংগীত প্রযোজক জর্জ মার্টিনের উদ্যোগে ৬২ সালে বের হয় ‘লাভ মি ডু’ অ্যালবাম৷ এই বছর থেকেই বিটলস’এর খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা শুধু ইংল্যান্ডেই নয়, ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপ জুড়ে৷ ১৯৬৪ সালে অ্যামেরিকা সফরের পর সারা বিশ্ব ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বিটলসম্যানিয়া৷ ৬৭ সালে তাঁরা ভারত সফর করেন৷ এই সময় জন লেনন ও জর্জ হ্যারিসন পণ্ডিত রবি শঙ্করের কাছে সেতারে তালিম নেন৷ ১৯৭০ সালে এই কিংবদন্তি শিল্পগোষ্ঠী ভেঙ্গে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় অসংখ্য সংগীতে সুরারোপ করেছেন লেনন ও ম্যাককার্টনি৷

সদস্যদের পরিচিতি:

জন লেনন: ভোকাল এবং রিদম গিটারিস্ট। বিটলসের প্রতিষ্ঠাতা জন লেনন। জন্ম ১৯৪০ সালের ৯ অক্টোবর ইংল্যাল্ডের লিভারপুল শহরে৷ স্কুল শিক্ষার সময় থেকেই রক সংগীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ৷ মায়ের কাছ থেকে ‘ব্যাঞ্জো’ বাদ্যযন্ত্রের তালিম পান তিনি৷ রক এন্ড রোল কিং এলভিস প্রেসলি ছিলেন তাঁর আদর্শ৷

মাত্র ৪০ বছর বয়সে, ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিটলস সংগীতগোষ্ঠীর এক অন্ধ ভক্তের গুলিতে নিহত হন রক ও পপ সংগীতের কিংবদন্তি জন লেনন৷ লেনন তাঁর সংগীত ও সমাজমুখীনতার মধ্য দিয়ে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে জেগে আছেন অসংখ্য সংগীতানুরাগীর অন্তরে৷

পল ম্যাককার্টনি: বিটলসের বেস গিটারিস্ট এবং ভোকাল। জন্ম ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুল। বিবিসি নিউজ থেকে তাকে উপাধি দেওয়া হয়েছে, “greatest composer of the millennium”। পল ম্যাককার্টনি এখনও জীবিত আছেন।

জর্জ হ্যারিসন: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জর্জ হ্যারিসন গীটার হাতে বাংলাদেশকে যেভাবে সাপোর্ট দিয়েছেন তা বাঙালি কোনদিন ভুলবে না। তিনি আমাদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন মহান ব্যক্তি।

পপ সঙ্গীতের জনপ্রিয় ইংল্যান্ডের এই শিল্পী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পন্ডিত রবি শংকরের অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১লা আগষ্টে এক বেনিফিট সঙ্গীত অনুষ্ঠানের কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজন করেছিলেন। এই কনসার্ট হতে সংগৃহীত ২,৫০,০০০ ডলার বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জন্য দেয়া হয়েছিল। মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববাসী আরও ভালোভাবে জেনেছিল, সভ্যতার ভয়াবহ গণহত্যা ও ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ। সেই থেকে বাংলাদেশের জনগণের কাছের মানুষ জর্জ হ্যারিসন।

জর্জ হ্যারিসনের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের লিভারপুলে। তাঁর স্কুল জীবনের শুরু হয় ডোভডেইল প্রাইমারি স্কুলে, যেখানে পড়ালেখা করেছেন বিটলসের আরেক কিংবদন্তী জন লেনন। ভালো রেজাল্ট করার সুবাদে তিনি লিভারপুল ইন্সটিউট অফ বয়জ এ পড়ালেখা করার সুযোগ পান। সেখানে তিনি ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। ১৪ বছর বয়সে তাঁর গীটারের প্রতি ঝোঁক বাড়ে, ক্লাসের ব্যাকবেঞ্ছে বসে গীটারের ছবি আঁকাই নেশা হয়ে দাঁড়ায়: “আমি তখন গীটারে পুরোপুরি ডুবে ছিলাম। আমাদের স্কুলের ১টা ছেলে তখন ৩ পাঊন্ড ১০ পেনি দিয়ে ১টা অ্যাকুয়েষ্টিক গীটার কিনেছিল। যদিও তখনকার সময়ে সেটা অনেক টাকা ছিল, মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে জীবনের প্রথম গীটারটি কিনলাম।” সেই স্কুলে হ্যারিসনের সাথে পরিচয় হয় পল ম্যাককার্টনির সাথে। পল ম্যাককার্টনি লেননের “দ্য কোয়ারিম্যান” ব্যান্ডে যোগ দেন। ম্যাককার্টনি হ্যারিসনকে দলে নেওয়ার জন্য লেননকে অনুরোধ করেন। ১৯৫৮ সালে হ্যারিসন সেই ব্যান্ডে যোগদান করেন। বিটলসে সবার ছোট ছিলেন হ্যারিসন। প্রথমদিকে কম বয়সের অযুহাতে লেনন এবং ব্যান্ডের অন্যান্য সদস্যরা তাঁকে নিতে গড়িমসি করলেও পরবর্তীতে হ্যারিসনের পারফরম্যান্সে সন্তষ্ট হয়ে তাঁকে দলে নেন। ১৫বছর বয়সে হ্যারিসন সেই ব্যান্ডের পুরোদস্তুর সদস্য হয়ে যান। ১৯৬০ সালে তিনি জার্মানির হামবুর্গে টনি শেরিডানের কাছ থেকে গীটারের উপর তালিম নেন। এই শিক্ষাই বিটলসের সঙ্গীত এবং হ্যারিসনের শান্ত পারফরম্যান্সের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। জর্জ হ্যারিসন তাঁর এই নিরব অংশগ্রহনের কারনে “শান্ত বিটলস” খ্যাতি পান।

২০০১ সালের ২৯ শে নভেম্বর ক্যান্সারে আক্রান্ত হ্যারিসন ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস্ এ মৃত্যুবরন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৫৮ বছর।

রিঙ্গো স্টার: জন্ম ১৯৪০ সালের জুলায়ে লিভারপুল, ইংল্যান্ড। তিনি এখনও জীবিত আছেন।

httpv://www.youtube.com/watch?v=_mUXwnEWEnE

এটি ১৯৬৫ সালে সেহা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক কনসার্টের ১০ মিনিটের একটি ভিডিও। ভিডিওটি দেখলে বিটলসের জনপ্রিয়তা কিছুটা ধারনা করা যায়।

 

দ্য বিটলস (The Beatles)

One thought on “দ্য বিটলস (The Beatles)

  • April 21, 2011 at 1:55 am
    Permalink

    বিটলসের গান আমারও ভাল লাগে। লেননের সিঙ্গেল গানগুলোও অসাধারণ। আমার একটা প্রিয় গান এ্যাড করলাম – “imagine”
    “When I was 5 years old, my mother always told me that happiness was the key to life. When I went to school, they asked me what I wanted to be when I grew up. I wrote down “happy”. They told me I didn’t understand the assignment.

    I told them they didn’t understand life.”

    — John Lennon

    httpv://www.youtube.com/watch?v=2xB4dbdNSXY

Leave a Reply